ক্যাটাগরিক্যাফে
ভাষাবাংলা
개시২৮ মার্চ, ২০২৬ এ ১৬:৪৭

লতাপাতায় ঢাকা বাগান ক্যাফে — থাইল্যান্ডের লুকানো রত্ন

#বাগান ক্যাফে#ডেজার্ট কেক রিভিউ#প্রকৃতির মাঝে ক্যাফে

বিষয়বস্তু

16টি আইটেম

থাইল্যান্ডের রায়ং-এ বাগানের ভেতরের ক্যাফে — দ্য ক্রিপার হাউস (The Creeper House)

থাইল্যান্ডের রায়ং (Rayong) শহরে থাকা দ্য ক্রিপার হাউস (The Creeper House) এই মুহূর্তে গুগল ম্যাপে সাময়িক বন্ধ (temporarily closed) দেখাচ্ছে। আবার খুলবে কিনা নিশ্চিত নয়, কিন্তু এই বাগান ক্যাফের যে পরিবেশ ছিল সেটা রেকর্ড করে রাখতে চাই বলেই এই লেখা।

আমি রায়ং-এ প্রায় ৩ বছর ছিলাম। আমার স্ত্রীর চাকরি রায়ং-এ ছিল বলে ওর সাথে গিয়েছিলাম। থাকতে থাকতে প্রতি উইকেন্ডে কোথাও যাওয়া দরকার হয়, তাই না? রায়ং কিন্তু ব্যাংককের মতো বা চিয়াংমাই-এর মতো ক্যাফে ফেমাস শহর না। বরং সেজন্যই এরকম জায়গা লুকিয়ে ছিল বলে মনে হয়। পর্যটন এলাকা না, কোনো গাইডবুকেও নেই — এমন একটা পাড়ায় একটা ক্যাফে আছে, আর সেটা অবাক করার মতো ভালো — এটাই গল্প।

দ্য ক্রিপার হাউস আমার স্ত্রী খুঁজে বের করেছিল। এক উইকেন্ডে বলল "চলো এখানে যাই", আর বাসা থেকে গাড়িতে প্রায় ৪০ মিনিট লাগল। রায়ং-এর রাস্তাঘাট বাংলাদেশ বা ভারতের মতো না — থাইল্যান্ডে বাঁ দিকে গাড়ি চালাতে হয়, সেটাই প্রথম ঝামেলা, আর রাস্তার অবস্থাও জায়গায় জায়গায় একেক রকম, তাই ৪০ মিনিট মনে হয় অনেক বেশি। থাইল্যান্ডে নিজে গাড়ি চালিয়ে ক্যাফে ঘুরতে চাইলে এই ব্যাপারটা মাথায় রাখবেন।

দ্য ক্রিপার হাউসের প্রবেশপথ — ক্যাফে না উদ্ভিদ উদ্যান?

দ্য ক্রিপার হাউসের প্রবেশপথ, HOUSE PLANT সবুজ ত্রিকোণ ছাদ আর লতাপাতায় ঢাকা বাগান ক্যাফের বাইরের দেয়াল

পৌঁছানোর পর প্রথমেই সন্দেহ হয় এটা আদৌ ক্যাফে কিনা। "HOUSE PLANT" লেখা সবুজ ত্রিকোণ ছাদ, একটা কাচের দরজা, আর পুরো দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া লতাপাতা। দেখে মনে হয় কোনো উদ্ভিদ উদ্যানের প্রবেশদ্বার। পাশে একটা ভিন্টেজ স্ট্রিট ল্যাম্প দাঁড়িয়ে, তার নিচে চকবোর্ড সাইনবোর্ডে লেখা "Cafe in HOUSE PLANT OPEN"। এটা না দেখলে সোজা হেঁটে চলে যেতাম। দরজার সামনে সাদা ফুল ফুটে আছে থোকায় থোকায় — কেউ লাগায়নি, এমনিতেই গজিয়েছে। থাইল্যান্ডের ক্যাফের ভয়ংকর ব্যাপার এটাই — ইচ্ছে করে সাজাতে হয় না, প্রকৃতি নিজে থেকেই পরিবেশ তৈরি করে দেয়।

আর পার্কিং নিয়ে একদম চিন্তা নেই। থাইল্যান্ডে ক্যাফে বা রেস্তোরাঁর সামনে পার্কিং-এর জায়গা প্রায় সবসময়ই পর্যাপ্ত থাকে। বাংলাদেশের মতো "পার্কিং আছে তো?" বলে আগে থেকে জিজ্ঞেস করার দরকার হয় না প্রায় কখনোই। জমি প্রচুর তো, দোকানের সামনেই গাড়ি রাখার জায়গা স্বাভাবিকভাবেই থাকে, না থাকলে রাস্তার ধারে রাখলেও চলে। থাইল্যান্ডে গাড়িতে ক্যাফে ঘোরার সবচেয়ে আরামের দিক এটা।

The Creeper House আর House Plant দিকনির্দেশনা দেখানো কাঠের পথচিহ্ন

ভেতরে ঢুকলে একটা কাঠের পথচিহ্ন (signpost) দাঁড়িয়ে আছে। ওপরের দিকে "The Creeper House", নিচে "House Plant" লেখা, তীর চিহ্ন আলাদা আলাদা দিকে। মানে ক্যাফের ভেতরে আলাদা জোন আছে। এই সাইনবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি না তুলে কেউ যায়নি।

ওপেন এয়ার বাগান বসার জায়গা — থাইল্যান্ডের ক্যাফের আসল জাদু

সাদা নুড়িপাথর বিছানো দ্য ক্রিপার হাউসের ওপেন এয়ার বাগান, লোহার টেবিল আর গাছের ছায়ায় সাদা বেঞ্চ

সাদা নুড়িপাথর বিছানো ওপেন এয়ার বাগানে দুই-তিনটা লোহার টেবিল। চারপাশে গাছ আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা, বাঁ দিকে পাথরের ফুলদানিতে হলুদ ফুল, গাছের ছায়ায় একটা সাদা লোহার বেঞ্চ। বসার জায়গা বলতে তিন-চারটা টেবিল, কিন্তু ঠিক সেই কারণেই মনে হয় সত্যি বাগানের মধ্যে বসে আছি।

আমরা এখানেই বসেছিলাম। আকাশে কিছুটা মেঘ ছিল, যেকোনো সময় স্কোয়াল (squall — গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়বৃষ্টি, অনেকটা আমাদের কালবৈশাখীর মতো) নামতে পারে এমন আবহাওয়া, তবে সেই কারণেই দুপুর হলেও বসে থাকা যাচ্ছিল। থাইল্যান্ডে ক্যাফেতে ওপেন এয়ারে বসতে চাইলে ঝকঝকে রোদের দিনের চেয়ে এরকম হালকা মেঘলা দিনই বরং ভালো।

এরকম পরিবেশ চারটে ঋতু থাকা দেশে তৈরি করা কঠিন। ভবন নিজেই বাগান, আর বাগান নিজেই ক্যাফে — এই কাঠামো সারা বছর গরম আবহাওয়া ছাড়া টিকিয়ে রাখা যায় না। বাংলাদেশ বা ভারতেও ওপেন এয়ার ক্যাফে আছে, কিন্তু গরমকালে বাইরে বসা প্রায় অসম্ভব। আবার শীতকালে কিছু জায়গায় ঠান্ডায় জমে যায়। থাইল্যান্ডে বর্ষাকালে (rainy season) প্রতিদিন স্কোয়াল এসে গরম কমিয়ে দেয়, কিন্তু আমাদের দেশে গরমকালে বৃষ্টি না হলে খালি গরমই থাকে। শেষ পর্যন্ত এসি ঘরে ঢুকতে হয়, তাই আমাদের দেশের ক্যাফে ইনডোর-কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। হিংসা না, বরং বুঝলাম যে আবহাওয়া আলাদা হলে জায়গার ধরনও আলাদা হয়।

বেকারি শোকেস — গ্রিনহাউসের ভেতরে কেক

দ্য ক্রিপার হাউসের ডেজার্ট বেকারি শোকেস, ফিরোজা দেয়াল আর বাল্বের আলো, লতা ঝুলে পড়া ইনডোর

আরো ভেতরে গেলে বেকারি শোকেস। ফিরোজা রঙের দেয়ালে গাছের ডালপালা বেয়ে বাল্বের সারি জ্বলছে, শোকেসে কেক সাজানো তাকে তাকে। পাশের চকবোর্ডে থাই ভাষায় অর্ডারের নিয়ম লেখা, "Order & Pay" — মানে আগে অর্ডার দিয়ে পেমেন্ট করতে হয়। বাঁ দেয়ালে "SUGAR LEVEL" চার্টও ছিল। ইনডোর হলেও লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে লতাপাতা ঝুলে আছে, বাইরে-ভেতরের সীমানা ঝাপসা। ক্যাফে বলার বদলে মনে হয় গ্রিনহাউসের মধ্যে কেক রেখে দিয়েছে কেউ।

কাঠের গোল স্লাইসের ওপর কেকের টুকরো আর ক্যাকটাস টবের সাথে সাজানো ডেজার্ট শোকেস ক্লোজআপ

শোকেস কাছ থেকে দেখলে, কাঠের গোল স্লাইসের (wood slice) ওপর একটা একটা করে কেকের টুকরো সাজানো, প্রতিটা স্বচ্ছ ফিল্মে মোড়া। ওপরের তাকে ক্যাকটাসের টব আর কেক পাশাপাশি রাখা — শোকেসটাই যেন ছোট্ট একটা বাগান। স্ট্রবেরি কেক, হানিকম্ব কেক, চকোলেট সিরিজ — বেশ কয়েক রকম ছিল।

সিগনেচার কেক — হানিকম্ব, চিজ চকোলেট চেরি, ক্যারট

দ্য ক্রিপার হাউসের সিগনেচার হানিকম্ব কেক, ক্রিম চিজের ওপর আস্ত মৌচাকের মধু আর রোজমেরি

সিগনেচার কেক (Signature Cake) লেখা হানিকম্ব কেক। ক্রিম চিজের ওপর আস্ত মৌচাক (honeycomb), পাশে রোজমেরির একটা ডাল। আলোর নিচে মৌচাকের হলুদ মধু আধা-স্বচ্ছ হয়ে চকচক করছিল। শোকেসের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। এটাই অর্ডার দিয়েছিলাম — পরে বিস্তারিত লিখছি।

সিগনেচার চিজ চকোলেট চেরি কেক, কালো চেরি আর ডেনমার্কের অর্গানিক চিজ চকোলেট, ১৭৫ বাত দাম

সিগনেচার ০২ নম্বর — চিজ চকোলেট চেরি (Cheese Chocolate Cherry)। ট্যাগে লেখা উপকরণ: কালো চেরি, ডেনমার্কের অর্গানিক চিজ চকোলেট (Organic Cheese Chocolate from Denmark), তাজা ব্লুবেরি, তাজা চেরি, ডালিম, কাকাও ক্রিম, চকোলেট বাটার। দাম ১৭৫ বাত। উপকরণের তালিকা দেখলে বোঝা যায় সাধারণ পাড়ার ক্যাফের লেভেল না এটা। তবে এটা খাইনি।

সিগনেচার ক্যারট কেক, ক্রিম চিজ ফ্রস্টিং আর মিক্স নাট টপিং, ১৬৫ বাত দাম

সিগনেচার ০১ নম্বর — ক্যারট কেক (Carrot Cake)। ক্রিম চিজ ফ্রস্টিং-এর ওপর গাজরের শিট, আখরোট, দারুচিনি, জায়ফল, আর ওপরে মিক্স নাট স্তূপ করে দেওয়া। দাম ১৬৫ বাত, মানে প্রায় $4.7 USD। থাইল্যান্ডে লোকাল রেস্তোরাঁয় এক বেলা খেতে ৫০-৬০ বাত লাগে — সেই হিসেবে একটা কেকের দাম তিন বেলা খাবারের সমান। থাইল্যান্ডের দামের তুলনায় স্পষ্টতই দামি। এটাও খাইনি, শোকেস থেকে শুধু ছবি তুলেছি।

ক্যারট কেকের পাশ থেকে দেখা, ক্রিম চিজ স্তর আর গাজর শিট স্তর আলাদা দেখা যাচ্ছে, আখরোট আমন্ড টপিং

একই ক্যারট কেক অন্য অ্যাঙ্গেল থেকে। স্বচ্ছ কাপের ভেতর ক্রিম চিজ স্তর আর গাজরের শিট স্তর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ওপরে আখরোট, আমন্ড, স্ট্রবেরি, রোজমেরি। উপকরণ দেখলে বোঝা যায় ডেনমার্কের অর্গানিক চিজ, রকমভেদে বাদাম বেছে বেছে দেওয়া, হার্বের সাজসজ্জা — দামি হলেও সস্তা উপকরণ দিয়ে ফাঁকি দেওয়ার কোনো চিহ্ন নেই।

এসি ইনডোর বসার জায়গা

দ্য ক্রিপার হাউসের এসি ইনডোর বসার জায়গা, চামড়ার সোফা আর সবুজ লোহার জানালা দিয়ে দেখা বাগান

গরম সহ্য না হলে এদিকেও আছে। মূল ভবনের ভেতরে এসি চালু ইনডোর সিটিং। বাদামি চামড়ার সোফা, ফ্যাব্রিক সোফা, গাছের ডালের প্যাটার্নের কুশন। সবুজ লোহার ফ্রেমের জানালা দিয়ে বাগান দেখা যাচ্ছে, কাচের টেবিলে "NO.4" সিট নম্বরের ট্যাগ। বসার জায়গা খুব বেশি না। আমি এখানে বসিনি। ৪০ মিনিট গাড়ি চালিয়ে এসি খেতে আসিনি তো।

থাইল্যান্ডের রায়ং-এর একটা ক্যাফেতে ১৬৫ বাত কি বেশি?

লতায় ঢাকা লোহার কাঠামোর নিচে ওপেন এয়ার বসার জায়গা থেকে দেখা দ্য ক্রিপার হাউসের বাগান
দ্য ক্রিপার হাউসের ওপেন এয়ার টেবিলে কেক আর ড্রিংকস, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছে ঘেরা পরিবেশ
দ্য ক্রিপার হাউসের বাগানের পুরো দৃশ্য, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফুল আর গাছের মাঝে ওপেন এয়ার বসার জায়গা

বেশি। সত্যি বলতে বেশি। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে — এখানে বাইরে বসে থাকলে সেটা মনেই হয় না। লতা বেয়ে ছাদ পর্যন্ত উঠে যাওয়া লোহার কাঠামোর নিচে বাতাস গায়ে লাগছে, পাশে নাম-না-জানা কোনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফুল ফুটে আছে, দূর থেকে কেউ থাই ভাষায় কিছু বলছে — আবছা শোনা যাচ্ছে। এটা টাকা দিয়ে বানানো যায় এমন পরিবেশ না। থাইল্যান্ড নামের দেশটার আবহাওয়া আর সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে মিশে তৈরি হওয়া একটা জায়গা।

হানিকম্ব কেক খেলাম

দ্য ক্রিপার হাউসের হানিকম্ব কেকের ভেতরের দিক, ক্রিম চিজ স্তর আর মৌচাকের মধু টপিং ক্লোজআপ
হানিকম্ব কেক ফর্ক দিয়ে কাটা, নরম চিজ স্তর আর ভেজা নিচের স্তরের ডেজার্ট ক্লোজআপ
প্লেটে হানিকম্ব কেক আর লেবুর স্লাইস, রোজমেরি সাজানো

হানিকম্ব কেক কাটলাম। এক কামড় খেয়ে বুঝলাম — এটা অসাধারণ। ওপরের চিজের অংশ নরম তুলতুলে, নিচেরটা একটু ম্যাট টেক্সচার কিন্তু ভেজা ভেজা। মুখের মধ্যে দুই স্তর মিশে যাওয়ার ব্যালান্সটা একদম পারফেক্ট। বাংলাদেশে বা ভারতে চিজকেক অনেক খেয়েছি, কিন্তু এখানকারটা একটু অন্যরকম ছিল। থাইল্যান্ডে থাকার সময় এরকমই হতো — নিজের দেশে কখনো পাওয়া যায় না এমন কম্বিনেশনের ডেজার্ট হঠাৎ পাড়ার ক্যাফেতে পেয়ে যাওয়া। গাইডবুকে নেই, গুগলেও ঠিকমতো আসে না — এরকম জায়গায় অপ্রত্যাশিত স্বাদ আবিষ্কার করা, এটাই বিদেশে থাকার আসল আনন্দ।

দ্য ক্রিপার হাউসের ওপেন এয়ার টেবিলে কেক খেতে খেতে বাগানের দৃশ্য দেখা

খেতে খেতে এই ভাবনা মাথায় এলো — কোনো বিদেশি মানুষ যদি বাংলাদেশে এসে আমাদের দেশের একটা আড্ডাখানা-স্টাইলের ক্যাফেতে বসে, সম্ভবত ঠিক এই অনুভূতিই হয়। "এটা আমার দেশে কখনোই পাওয়া সম্ভব না!" — এই অনুভূতি। ভ্রমণে ক্যাফে থেকে যে সুখটা পাওয়া যায় সেটা শেষমেশ এটাই, তাই না? নিজের দেশে কখনো তৈরি করা যায় না এমন একটা জায়গায় কিছুক্ষণের জন্য ঢুকে পড়া। তাই দাম বেশি হলেও যাই, দূরে হলেও যাই, বন্ধ হয়ে গেলেও মনে থাকে — আমার ধারণা এটাই কারণ।

মৌচাকের মধু ক্লোজআপ

হানিকম্ব কেকের ওপর মৌচাকের মধু ক্লোজআপ, ষড়ভুজ ঘর থেকে মধু গড়িয়ে পড়ছে

হানিকম্ব কেকের ওপরে বসানো মৌচাকটা কাছ থেকে ছবি তুললাম। ষড়ভুজ ঘরগুলোর ফাঁক দিয়ে মধু গড়িয়ে পড়ছে। সাজসজ্জার জন্য পাতলা করে কাটা কোনো টুকরো না — সত্যিকারের একটা মৌচাকের গোটা একটা খণ্ড তুলে বসিয়ে দিয়েছে। আঙুল দিয়ে তুলতে গেলাম, মধু গড়গড় করে হাতে পড়ে হাত মাখামাখি হয়ে গেল — কিন্তু সেটা খারাপ লাগেনি। বাংলাদেশ বা ভারতেও কিছু ক্যাফেতে হানিকম্ব টপিং দেয়, কিন্তু এই পুরুত্বের মৌচাক এই দামে দেওয়া আমি আর কোথাও দেখিনি।

আঞ্চান পানীয় — সত্যি বলতে স্বাদ তেমন ভালো লাগেনি

দ্য ক্রিপার হাউসের আঞ্চান (butterfly pea flower) পানীয়, বেগুনি পাপড়ি আর ব্লুবেরি টপিং
আঞ্চান পানীয়ের ওপর বেগুনি পাপড়ি আর পান্দানুস পাতা, কমলালেবুর স্লাইস

আঞ্চান (อัญชัน, butterfly pea flower — অপরাজিতা ফুল) গোটা গোটা বসানো একটা পানীয় অর্ডার দিলাম। বেগুনি পাপড়ির ফাঁকে ব্লুবেরি গেঁথে আছে, পান্দানুস পাতা উঁচু হয়ে বেরিয়ে আছে — পানীয় না ফুলদানি সেটা বোঝা মুশকিল, এমন চেহারা।

সত্যি কথা বলতে গেলে, স্বাদ ছিল সোডায় সিরাপ মেশানো। ব্যস, ঠিক এই স্বাদ। মিষ্টি, গ্যাস আছে, ফুলের গন্ধ প্রায় নেই। এটা বাংলাদেশের কোনো ক্যাফেতে থাকলেও শুধু স্বাদের কথা ভাবলে দ্বিতীয়বার অর্ডার দিতাম না। কিন্তু এই বাগানে, মেঘলা বিকেলে, এই চেহারা নিয়ে যখন হাতে আসে — তখন শুধু ভালো লাগে। স্বাদে খাওয়ার পানীয় না, চোখে দেখার পানীয়। এখানকার আঞ্চান পানীয় এরকমই। স্বাদে প্রত্যাশা রাখলে হতাশ হতে পারেন — তাই আগে থেকেই বলে রাখছি।

আঞ্চান পানীয়ের পুরো চেহারা, বেগুনি-কমলা-হলুদ গ্র্যাডিয়েন্ট স্তর আর THE CREEPER HOUSE স্টিকার

কাপটা পুরো দেখা যায় এমন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুললাম। ওপর থেকে বেগুনি, মাঝে কমলা, নিচে হালকা হলুদ — স্তরগুলো স্বাভাবিকভাবে ভাগ হয়ে আছে। কাপে ফিরোজা রঙের "THE CREEPER HOUSE — Cafe · Garden · House Plant" স্টিকার লাগানো, কাঠের ডেক টেবিলে রাখতেই পেছনে গোলাপি-সবুজ পাতার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি হয়ে গেল। আলাদা করে ফটোজোন বানানোর দরকার নেই এই ক্যাফেতে।

ক্যাফের পাশের ঝোপের ভেতর রাখা আঞ্চান পানীয়ের কাপ, বেগুনি ফুল আর সবুজ পাতার সাথে মিশে গেছে

তাই মজা করে ক্যাফের পাশের ঝোপের ভেতর কাপটা গুঁজে দিলাম। সত্যি বলছি। বেগুনি ফুল আর সবুজ পাতা মিলে দেখে মনে হচ্ছিল এখানেই জন্মেছে। এই ক্যাফে এমন যে, যেখানেই রাখো সেটাই ব্যাকগ্রাউন্ড হয়ে যায়। ব্যাকগ্রাউন্ড বাছাই করতে না হওয়া ক্যাফে এটাই প্রথম পেলাম।

ক্যারামেল ম্যাকিয়াতো

দ্য ক্রিপার হাউসের ক্যারামেল ম্যাকিয়াতো, ঢাকনার ওপর থেকে দেখা বাদামি গ্র্যাডিয়েন্ট
ক্যারামেল ম্যাকিয়াতোর ঢাকনা খুলে ওপর থেকে তোলা ছবি, ক্যারামেল আর বরফ মেশা বাদামি পানীয়

সাথে যাওয়া আমার স্ত্রী অর্ডার দিয়েছিল ক্যারামেল ম্যাকিয়াতো। ঢাকনার ভেতর দিয়ে দেখা রঙটা বেশ গাঢ় ছিল। থাইল্যান্ডের ক্যাফের কফি আসলেই একটু জোরালো হয়, এখানেও তাই। বরফের ফাঁকে ক্যারামেল মিশে বাদামি গ্র্যাডিয়েন্ট তৈরি হচ্ছিল দেখে ঢাকনা খোলার আগে এক ছবি, খোলার পরে আরেক ছবি তুললাম। স্বাদ মিষ্টি, কিন্তু কফিটা নিজে এতটা জোরালো যে মিষ্টিতে চাপা পড়েনি।

দ্য ক্রিপার হাউসের বাগানে হাঁটাহাঁটি

দ্য ক্রিপার হাউসের সাদা নুড়িপাথরের পথ আর দুপাশে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝোপ, HOUSE PLANT সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে
বাগানের উলটো দিক থেকে দেখা ভিন্টেজ স্ট্রিট ল্যাম্প আর পাথরের ফুলদানি, ভবনের ছাদের রেখা মিলেমিশে

আবার বাইরে বেরিয়ে এলাম। সাদা নুড়িপাথরের পথ ভবনগুলোর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে, দুপাশে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝোপ এত ঘন যে পথ বলার বদলে হাঁটার পথ বলা ভালো। প্রবেশদ্বারের দিক থেকে তুললে পুরো বাগান এক ফ্রেমে আসে, উলটো দিক থেকে তুললে স্ট্রিট ল্যাম্প, পাথরের ফুলদানি, পেছনের ভবনের ছাদ — স্তরে স্তরে জমে ওঠে। এই জায়গায় আগে বাগান তৈরি হয়েছে, তারপর বাগানের ভেতরে ক্যাফে ঢুকেছে। বানানো বাগান না, গড়ে ওঠা বাগান।

হলুদ দেয়াল, সবুজ লতা, লাল দরজা — Into the Garden

হলুদ বাইরের দেয়ালে লাল দরজার ফ্রেম, লতায় আধা ঢাকা ভবন আর Into the Garden হাতের লেখা কাচের জানালায়
লাল দরজার ফ্রেমের ওপার থেকে দেখা ভেতরটা, রাটান চেয়ার আর এডিসন বাল্বের আলো, বড় ফুলের টব

হলুদ বাইরের দেয়ালে লাল দরজার ফ্রেম, তার ওপর লতা অর্ধেক ঢেকে দিয়েছে — আরেকটা ভবন ছিল। কাচের জানালায় "Into the Garden" হাতের লেখা, দরজার ওপরে "CREEPER HOUSE" পুরনো কাঠের সাইনবোর্ড। দরজা খুললে রাটান চেয়ার আর কাঠের টেবিল, ছাদে এডিসন বাল্ব সারি সারি ঝুলছে আর কোণায় বড় ফুলের টব। লাল দরজার ফ্রেমের ওপার দিয়ে ভেতরে উঁকি দেওয়ার মতো করে তোলা ছবিটাই সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে। হলুদ দেয়াল, সবুজ লতা, লাল দরজা — এই রঙের মিশ্রণ থাইল্যান্ড বলেই সম্ভব বলে আমার মনে হয়।

মেনু কার্ডের ডিজাইন আর ছোটখাটো জিনিসের যত্ন

লোহার স্ট্যান্ডে কাঠের ক্লিপে ঝোলানো মেনু কার্ড, GARDEN SODA আর HAPPY DAY MILK মেনু
দ্য ক্রিপার হাউসের মেনু কার্ড ক্লোজআপ, Snow Pink Galaxy Deep Love Aden পানীয়ের নাম
সাদা মিনিয়েচার ঘরের আকৃতির টিপ বক্স, ছাদে পেন্সিলে আঁকা ইটের নকশা আর পাতা

ঢোকার দিকের লোহার স্ট্যান্ডে মেনু কার্ডগুলো কাঠের ক্লিপে ঝুলানো ছিল — এটাও না দেখে যাওয়া যায় না। "COFFEE — GET READY TO ENJOY!" কার্ডের পাশে "GARDEN SODA" সিগনেচার ড্রিংকের কার্ড, Snow Pink, Galaxy Deep, Love Aden — এসব নামের পানীয়। "HAPPY DAY MILK" কার্ডও ছিল। আর কাউন্টারের ওপরে টিপ বক্স — সাদা রঙের মিনিয়েচার ঘরের আকৃতির, ছাদে পেন্সিল দিয়ে ইটের নকশা আর পাতা আঁকা, আর চিমনির ছিদ্র দিয়ে কয়েন ফেলতে হয়। এক একটা ছোটখাটো জিনিসে এতটা মনোযোগ দেওয়া ক্যাফে খুব কমই পেয়েছি।

যাওয়ার সময় বেশিরভাগ অতিথি ছিল থাই স্থানীয়রা। বিদেশি ছিল একটা-দুটো গ্রুপ, যেটা পরে ভিডিও দেখতে গিয়ে খেয়াল করলাম। রায়ং-এর এরকম লোকাল ক্যাফেতে বিদেশি বসে আছে দেখে অবাক হলাম। কীভাবে খুঁজে এসেছে? সম্ভবত আমার মতোই কারো পরামর্শে।

প্রায় এক ঘণ্টা থেকে বেরিয়ে এলাম। বেশিক্ষণ থাকিনি, কিন্তু স্মৃতি অনেকদিন থেকে গেছে।

দ্য ক্রিপার হাউস (The Creeper House) ভিজিট তথ্য

ঠিকানা: 34, 8 ถนนสาย 11, Map Kha, Nikhom Phatthana District, Rayong 21180, Thailand

সময়সূচি: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা (মঙ্গলবার বন্ধ)

সিগনেচার কেক: ১৬৫-১৭৫ বাত (প্রায় $4.5-5 USD)

পানীয়ের দাম: সঠিক মনে নেই

যোগাযোগ: +66-92-927-7200 (คุณเฟิร์น)

বর্তমানে গুগল ম্যাপে সাময়িক বন্ধ (temporarily closed) দেখাচ্ছে। যাওয়ার আগে অবশ্যই আগে চেক করে নেবেন।

শেষ কথা

সাময়িক বন্ধ — এই কথাটা কবে বদলাবে জানি না, কিন্তু অন্তত আমি যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন জায়গাটা নিশ্চিতভাবে জীবন্ত ছিল। দাম বেশি লেগেছিল, আঞ্চান পানীয় সত্যি বলতে তেমন ভালো লাগেনি, গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার পথও সহজ ছিল না। তারপরও ছবি দেখলে আবার যেতে ইচ্ছে করে। আবার দরজা খুললে আবার ৪০ মিনিট গাড়ি চালিয়ে যাব। হাতে মধু মেখে মৌচাক ভাঙতে।

এই পোস্টটি মূলত প্রকাশিত হয়েছিল https://hi-jsb.blog.

작성일 ২৮ মার্চ, ২০২৬ এ ১৬:৪৭
수정일 ১০ এপ্রিল, ২০২৬ এ ০২:৫০