সেরা কোরিয়ান সি-ফুড: র-ফিশ রেস্তোরাঁর ফুল কোর্স
কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁ, শুধু খাবার নয়, একটি সংস্কৃতি
আপনি যদি দক্ষিণ কোরিয়ায় আসেন এবং মাছ খেতে ভালোবাসেন, তবে আপনার জন্য দারুণ একটি খবর আছে! দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল, বুসান এবং জেজু দ্বীপের মতো উপকূলীয় শহরগুলোর কথা তো বাদই দিলাম, সমুদ্র থেকে অনেক দূরের মূল ভূখণ্ডের যেকোনো শহরেও আপনি একদম তাজা মাছ ও কোরিয়ান সি-ফুড উপভোগ করতে পারবেন। আমি বর্তমানে 'তেজন' (সিউল থেকে প্রায় ২ ঘণ্টা দক্ষিণের একটি শহর) শহরে থাকি। তেজনের মতো সমুদ্রবিহীন একটি শহরেও যে পাড়ার রেস্তোরাঁয় বসেই একদম তাজা কাটা মাছের সাশিমি উপভোগ করা যায়, এটিই কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁ বা 'হোয়েত-জিপ' সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। আজ আমি নির্দিষ্ট কোনো রেস্তোরাঁর রিভিউ দেওয়ার বদলে, কোরিয়ানরা পাড়ার রেস্তোরাঁগুলোতে কীভাবে এই খাবারগুলো উপভোগ করে, সেই গল্পই আপনাদের শোনাবো। চলুন শুরু করা যাক!

র-ফিশ রেস্তোরাঁর কোর্সের দুটি স্টাইল
বেশিরভাগ কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁয় খাবারগুলো মূলত একটি 'কোর্স' হিসেবে পরিবেশন করা হয়। এই কোর্সগুলো সাধারণত দুটি ভিন্ন স্টাইলে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো 'সাইড ডিশ' (স্কিদাসি) ভিত্তিক কোর্স, যেখানে মূল খাবারের সাথে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের আনুষঙ্গিক খাবার পরিবেশন করা হয়। আর দ্বিতীয়টি হলো শুধুমাত্র মূল মাছের ওপর ফোকাস করা 'সিঙ্গেল মেনু' কোর্স, যেখানে তেমন কোনো সাইড ডিশ থাকে না। সাইড ডিশ ভিত্তিক কোর্সের দাম একটু বেশি হলেও, এতে মাছের পাশাপাশি নানা রকম মজাদার খাবার চাখার সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, সিঙ্গেল কোর্সে আপনি শুধু নিজের পছন্দের মাছটিই বেছে নিতে পারবেন। আজ আমি আপনাদের সাথে সেই জমজমাট কোর্সটির পরিচয় করিয়ে দেবো, যেখানে টেবিলভর্তি সাইড ডিশ পরিবেশন করা হয়।
সাইড মেনুর শুরু, স্যালাড 🥗

সাইড মেনুর শুরুটা হয় এক বাটি সতেজ স্যালাড দিয়ে। মচমচে লেটুস পাতার ওপর টক-মিষ্টি ড্রেসিং ছড়ানো এই সাধারণ কিন্তু পরিচ্ছন্ন ডিশটি মূল ভারি খাবার অর্থাৎ মাছ আসার আগে আপনার ক্ষুধা বাড়াতে দারুণ কাজ করে। দেখতে খুব সাধারণ মনে হলেও, এটি ছাড়া পুরো কোর্সটিই যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়।
ডিমের স্টিউ ও সিউইড স্যুপ — পেট শান্ত করার দারুণ কম্বো 🥚

বাঁ দিকে দেখতে পাচ্ছেন 'ডিমের স্টিউ' (Gyeran-jjim), যা কোরিয়ান স্টাইলে তৈরি অত্যন্ত নরম এবং ফোলা ফোলা একটি ডিমের পদ। আর ডান দিকে রয়েছে 'সিউইড স্যুপ' (Miyeok-guk), যা সামুদ্রিক শৈবাল দিয়ে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান স্যুপ। দক্ষিণ কোরিয়ায় মানুষের জন্মদিনে এই স্যুপটি খাওয়ার একটি বিশেষ প্রচলন রয়েছে। এই দুটি খাবারের স্বাদই খুব হালকা এবং মসলাবিহীন হওয়ায়, কাঁচা মাছ খাওয়ার আগে এগুলো পেটকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।

এই ডিমের স্টিউ বা 'গেরান-জিম' শুধু র-ফিশ রেস্তোরাঁয় নয়, বরং পর্ক বেলি (সামগিওপসাল) রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন স্যুপের দোকান এবং প্রায় সব ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান ডাইনিংয়ে একটি সাধারণ সাইড ডিশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। কোরিয়ান বারবিকিউ রেস্তোরাঁয় মাংস পোড়ানোর সময় এক বাটি ডিমের স্টিউ অর্ডার করাটা যেন এখানকার একটি অলিখিত নিয়ম! এটি কোরিয়ান খাবার সংস্কৃতির এমন একটি অংশ, যাকে কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যায় না।
মিক্সড ভেজিটেবল ও কিমচি — কোরিয়ান ডাইনিংয়ের মূল ভিত্তি

এটি হলো তাজা পাতাওয়ালা সবজির সাথে লাল মরিচের গুঁড়া এবং তিলের ড্রেসিং দিয়ে মাখানো এক ধরনের কোরিয়ান স্টাইলের স্যালাড। সাশিমির সাথে এটি খেলে তা মাছের কাঁচা স্বাদ বা তেলতেলে ভাব দূর করে মুখকে সতেজ করে তোলে। দেখতে খুব সাধারণ হলেও এর স্বাদ কিন্তু দারুণ আসক্তি তৈরি করে।

কিমচি (Kimchi) হলো দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত গাঁজন করা খাবার (fermented food), যা দেশের যে কোনো রেস্তোরাঁয় গেলে আপনি পাবেনই। এটি মূলত বাঁধাকপিকে লাল মরিচের গুঁড়া, রসুন এবং ফারমেন্টেড সি-ফুড সস দিয়ে মেখে গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। এর স্বাদ বেশ মশলাদার এবং টক। কোরিয়ানদের কাছে কিমচি ছাড়া খাবার টেবিল যেন একেবারে শূন্য। বিদেশি পর্যটকদের কাছে এর স্বাদ প্রথমে একটু অন্যরকম লাগতে পারে, কিন্তু আপনি যদি দক্ষিণ কোরিয়ায় আসেন, তবে এই খাবারটি চেখে দেখা আপনার জন্য মাস্ট!
সাশিমি আসার আগেই টেবিল কানায় কানায় পূর্ণ 🍽️

স্যালাড, মিক্সড ভেজিটেবল, কিমচি, ডিমের স্টিউ থেকে শুরু করে সিউইড স্যুপ পর্যন্ত—মূল মাছ পরিবেশন করার আগেই টেবিল একেবারে কানায় কানায় ভরে গেছে। কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁর কোর্সের প্রধান আকর্ষণই হলো এই বিশাল সাইড ডিশের আয়োজন। শুধুমাত্র সাইড ডিশগুলো দিয়েই এক বেলার পেটপূজা অনায়াসে হয়ে যায়! মূল খাবার আসার আগেই আপনি অনুভব করবেন যে আপনাকে কত রাজকীয়ভাবে আপ্যায়ন করা হচ্ছে।
সামজাং — সি-ফুড ও বারবিকিউ সবখানেই অপরিহার্য সস 🌶️

সামজাং (Ssamjang) হলো লাল মরিচের পেস্ট, রসুন, পেঁয়াজ পাতা ইত্যাদি মিশিয়ে তৈরি করা এক ধরনের বিশেষ কোরিয়ান সস। একটি লেটুস বা পেরিলা (Perilla) পাতার ওপর এক টুকরো কাঁচা মাছ রেখে তাতে সামান্য সামজাং মাখিয়ে মুখে দিলে, মাছের সতেজ স্বাদের সাথে সসের গাঢ় নোনতা স্বাদ মিশে এক জাদুকরী অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এটি শুধু র-ফিশ রেস্তোরাঁয় নয়, বরং কোরিয়ান বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলোতেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। মজার ব্যাপার হলো, রেস্তোরাঁভেদে এর উপাদান বা ঘনত্ব কিছুটা আলাদা হয়, ফলে একই নামের সস হলেও এর স্বাদ একেক জায়গায় একেক রকম লাগে। কোরিয়ান খাবার সংস্কৃতিতে সামজাং শুধু একটি সস নয়, বরং এটি নিজেই একটি বিশেষ খাবারের মর্যাদায় পৌঁছে গেছে।
সি-ফুড ফ্রাই — রাস্তার ধারের ভাজাভুজির চেয়ে একদম আলাদা 🍤

এবার ধীরে ধীরে মূল কোর্সের খাবারগুলো আসতে শুরু করেছে। প্রথমেই এলো সি-ফুড ফ্রাই। চিংড়ি, মাছের টুকরো ইত্যাদিকে ব্যাটারে ডুবিয়ে মুচমুচে করে ভাজা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ভাজাভুজি বা ফ্রাই শুধু রেস্তোরাঁতেই নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতেও বেশ জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড হিসেবে খাওয়া হয়। বাজারের ভাজাভুজি সস্তা এবং চোখের সামনে গরম গরম ভেজে দেওয়ার কারণে এর একটা আলাদা মজা আছে। তবে রেস্তোরাঁর এই ভাজাভুজিতে অত্যন্ত তাজা ও উন্নত মানের সামুদ্রিক খাবার ব্যবহার করা হয়। একই খাবার হওয়া সত্ত্বেও দুটি জায়গাতে এটি উপভোগ করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা, যা সত্যিই দারুণ মজার।


খুব কাছ থেকে দেখলে খেয়াল করবেন, ভাজা আবরণের ভেতর আস্ত মোটা একটি চিংড়ি উঁকি দিচ্ছে। এটি এমন এক খাবার যা আগে চোখ দিয়ে উপভোগ করতে হয়, আর তারপর জিভ দিয়ে।
আজকের প্রধান আকর্ষণ, মিকসড সাশিমি (মোউম-হোয়ে) 🐟

অবশেষে আজকের মূল আকর্ষণ টেবিলে চলে এসেছে। এই মিক্সড সাশিমির (Modeum-hoe) সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, আপনি এক প্লেটেই কয়েক ধরনের মাছের স্বাদ একসাথে উপভোগ করতে পারবেন। আপনি যদি সিঙ্গেল মেনু অর্ডার করেন, তবে প্লেটে কেবল এক ধরনের মাছ (যেমন: ফ্ল্যাটফিশ বা রকব্রিয়াম) দেওয়া হবে। কিন্তু মিক্সড সাশিমিতে ৩ থেকে ৪টি ভিন্ন প্রজাতির মাছ একসাথে পরিবেশন করা হয়। প্লেটের ওপর পেরিলা পাতা বিছিয়ে, শসা ও গাজর দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে এবং মাছের সতেজতা ধরে রাখতে নিচে বরফ দিয়ে পরিবেশন করার এই পদ্ধতিটি হলো কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁর এক অনন্য স্টাইল। যারা জীবনে প্রথমবার সাশিমি চেখে দেখছেন, তাদের জন্য এটি সেরা পছন্দ। কারণ এর মাধ্যমে আপনি বিভিন্ন মাছের স্বাদ যাচাই করে দেখতে পারবেন।



ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল পরিবর্তন করে কয়েকটি ছবি তুললাম। মাছের প্রতিটি স্লাইসের প্রাণবন্ত টেক্সচার ছবিগুলোতে খুব স্পষ্ট। মিক্সড সাশিমির এমন নিখুঁত রং এবং প্লেটিং দেখে সত্যিই মুখে পানি চলে আসে, এর সৌন্দর্যের প্রশংসা করার কোনো ভাষা নেই।
আস্ত মাছ ভাজা — একদম মুচমুচে


এটি হলো একটি আস্ত মাছ, যেটিকে খুব মচমচে করে ভেজে তার ওপর মশলাদার সস এবং কুচি করা পেঁয়াজ পাতা দিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে। এর বাইরের অংশটা বেশ মুচমুচে আর ভেতরের মাংসটুকু খুব নরম। ক্লোজ-আপ ছবিতে উপরের ওই মশলাদার সসটি দেখতে আরও লোভনীয় লাগছে। শুধুমাত্র এই একটি ডিশ দিয়েই এক বাটি ভাত নিমিষেই শেষ করে ফেলা সম্ভব!
কোরিয়ান সি-ফুড রেস্তোরাঁয় সাশিমি খাওয়ার দুটি উপায় 🥬


সয়া সস বা চিলিসসে ডুবিয়ে খাওয়া
মাছের টুকরোটিকে হালকা করে কোরিয়ান চিলিসস (চোজং) বা ওয়াসাবি সয়া সসে ডুবিয়ে সরাসরি খাওয়া।
এটি মাছের একদম নিজস্ব আসল স্বাদ ও টেক্সচার বুঝতে সাহায্য করে। যারা মাছের সতেজতা পুরোপুরি উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এটি দারুণ পদ্ধতি।
পাতায় মুড়িয়ে খাওয়া
লেটুস বা পেরিলা পাতার ওপর মাছের টুকরো এবং সামজাং রেখে একসাথে মুড়িয়ে এক লোকমায় খেয়ে ফেলা।
পাতার সতেজ কচকচে ভাব এবং সামজাং সসের নোনতা স্বাদ মাছের সাথে মিশে দারুণ এক কম্বিনেশন তৈরি করে। যারা বিভিন্ন স্বাদের মিশ্রণ পছন্দ করেন তাদের জন্য এটি সেরা।
এই দুটি উপায়েরই নিজস্ব আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। আপনি যদি এই দুটি পদ্ধতি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করে খান, তবে শেষ টুকরো পর্যন্ত আপনার একটুও একঘেয়েমি লাগবে না। লেটুস পাতার ওপর এক টুকরো মাছ, একটুখানি সামজাং এবং এরপর পুরোটা একসাথে মুখে পুরে দেওয়া—এটিই হলো আসল কোরিয়ান স্টাইল!
ভিন্ন স্বাদের সি-ফুড — সি স্কুইর্ট, সি কিউকাম্বার এবং অ্যাবালোন
সি স্কুইর্ট (Meongge) — মনে হবে যেন পুরো সমুদ্র গিলে খাচ্ছেন





সি স্কুইর্ট বা মিয়ংগে (Meongge) কোরিয়ানদের অন্যতম প্রিয় একটি সামুদ্রিক খাবার হলেও বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি বেশ অপরিচিত। এটি মূলত সমুদ্রের তলদেশে পাথরের সাথে লেগে থাকা এক প্রকার সামুদ্রিক প্রাণী। এর বাইরের অংশটা এবড়োখেবড়ো এবং রঙটি গাঢ় কমলা। বিশ্বব্যাপী খুব কম দেশেই এটি খাওয়া হয়, প্রধানত দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানেই এটি খাদ্য হিসেবে বেশি প্রচলিত, তাই এটি সত্যিই একটি ব্যতিক্রমী খাবার। এর স্বাদ শুধু আঁশটেই নয়, বরং মুখে দিলেই মনে হবে যেন পুরো সমুদ্রের গাঢ় নোনতা স্বাদ আপনার মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এই স্বাদ একদম পছন্দ করেন না, আবার অনেকেই একবার এর স্বাদ পেলে বারবার খেতে চান! দক্ষিণ কোরিয়ায় এলে এই ভিন্নধর্মী খাবারটি অন্তত একবার চেখে দেখা উচিত।
সি কিউকাম্বার (Haesam) — চিবানোর দারুণ অভিজ্ঞতা



সি কিউকাম্বার (Haesam) বা সমুদ্রশশা হলো আক্ষরিক অর্থেই সমুদ্রের শসা। চীনে এটিকে শুকিয়ে অত্যন্ত দামি রেসিপিতে ব্যবহার করা হয়, আর জাপানে এটি ভিনেগার দিয়ে মেখে খাওয়ার রেওয়াজ বেশি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় এটিকে একটু ভিন্নভাবে খাওয়া হয়। কোরিয়ানরা এটি একেবারে কাঁচা, সাশিমির মতো স্লাইস করে খায়। এর প্রধান আকর্ষণ হলো এর চিবানোর মতো রাবারের মতো কচকচে টেক্সচার। আপনি এটি যত চিবোবেন, সামুদ্রিক নোনতা স্বাদ তত বেশি পরিষ্কারভাবে অনুভব করবেন। সি স্কুইর্টের মতোই এটিও সবার পছন্দ হয় না, তবে আপনি যদি সত্যিকারের কোরিয়ান সি-ফুড সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা নিতে চান, তবে এটি চেখে দেখা মাস্ট। পেরিলা পাতার ওপর রেখে কোরিয়ান চিলিসসে (চোজং) ডুবিয়ে খেলে এর স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়।
অ্যাবালোন সাশিমি (Jeonbok-hoe) — ওয়ানডোর তাজা অ্যাবালোনের ম্যাজিক



খেতে খেতেই হঠাৎ করে টেবিলে আরও নতুন নতুন সাইড ডিশ আসতে থাকাটাই হলো কোরিয়ান র-ফিশ কোর্সের আসল ম্যাজিক। এবার এলো অ্যাবালোন সাশিমি (Jeonbok-hoe)। দক্ষিণ কোরিয়ায় অ্যাবালোন বা সামুদ্রিক শামুকের কথা বললেই প্রথমে যে জায়গাটির নাম মাথায় আসে, তা হলো ওয়ানডো (Wando)। এটি দক্ষিণ উপকূলের একটি দ্বীপ। এখানকার পরিষ্কার সমুদ্রের পানি এবং প্রচুর সামুদ্রিক শৈবালের কারণে ওয়ানডোকে অ্যাবালোন চাষের জন্য সেরা জায়গা ধরা হয়। ওয়ানডোর অ্যাবালোনের মাংস বেশ শক্তপোক্ত এবং স্বাদ অত্যন্ত গভীর, তাই এটি পুরো কোরিয়ায় শীর্ষ মানের উপাদান হিসেবে বিবেচিত। কোরিয়ানরা এটিকে সাশিমির মতো পাতলা করে কেটে চিলিসস দিয়ে কাঁচাই খেতে পছন্দ করে, আবার অনেকে সেদ্ধ করে নরম করেও খায়। ছোট বাটিতে অ্যাবালোনের যে ভেতরের অংশটুকু দেখতে পাচ্ছেন, কোরিয়ানদের অনেকেই এটিকে আলাদা একটি সুস্বাদু খাবার হিসেবে বেশ উপভোগ করেন।
কোর্সের শেষ চমক, স্পাইসি সি-ফুড স্যুপ (হ্যামুল মেউনতাং) 🔥




অবশেষে আমাদের কোর্সের একেবারে শেষ ধাপে চলে এসেছি, আর তা হলো স্পাইসি সি-ফুড স্যুপ বা হ্যামুল মেউনতাং (Haemul Maeuntang)। কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁগুলোতে মাছ কাটার পর সাধারণত কিছুই ফেলে দেওয়া হয় না। সাশিমির জন্য মাছের মূল মাংসটুকু কেটে নেওয়ার পর মাছের কাঁটা ও তার সাথে লেগে থাকা অবশিষ্ট মাংসটুকু ফেলে না দিয়ে, তার সাথে অক্টোপাস, ঝিনুকসহ নানা রকম সামুদ্রিক প্রাণী মিশিয়ে এই ঝাল স্যুপটি তৈরি করা হয়। পেঁয়াজ পাতা ও লাল মরিচের গুঁড়া দিয়ে তৈরি টগবগ করে ফুটতে থাকা এই লাল রঙের স্যুপটি দেখতে সত্যিই অসামান্য। কাঁচা মাছ খাওয়ার পর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পেটকে আবার গরম ও শান্ত করতে এই স্যুপটি জাদুর মতো কাজ করে। এর মশলাদার স্বাদ মুখের ভেতরে থাকা মাছের আঁশটে ভাব পুরোপুরি দূর করে দেয়। কোর্স শেষ করার জন্য এর চেয়ে ভালো ফিনিশিং আর হতেই পারে না। এটি কোরিয়ান খাবার সংস্কৃতির এমন একটি দিক তুলে ধরে, যেখানে কোনো উপাদানই অপচয় করা হয় না।
কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁর কোর্সের দাম কত হতে পারে?
অনেকেই হয়তো ভাবছেন যে, কোরিয়ান র-ফিশ কোর্সের দাম অনেক বেশি। কিন্তু সত্যি বলতে, এর দাম আপনার ধারণার চেয়ে বেশ যুক্তিসঙ্গত। নিচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন র-ফিশ রেস্তোরাঁর কোর্সের গড় খরচের একটি তালিকা দেওয়া হলো। তবে মনে রাখবেন, অঞ্চল এবং রেস্তোরাঁভেদে এই দামে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।
BUDGET
সাশ্রয়ী মূল্য
১ জন · $১৫~$২২
২ জন · $৩০~$৪৫
৩ জন · $৪৫~$৬৭
৪ জন · $৬০~$৯০
STANDARD
মাঝারি দাম
১ জন · $৩০~$৪৫
২ জন · $৬০~$৯০
৩ জন · $৯০~$১৩৫
৪ জন · $১২০~$১৮০
PREMIUM
উচ্চ মূল্য
১ জন · $৫০~$৭৫↑
২ জন · $১০৫~$১৫০↑
৩ জন · $১৫৫~$২২৫↑
৪ জন · $২১০~$৩০০↑
※ উপরের দামগুলোতে সাইড ডিশের খরচ অন্তর্ভুক্ত আছে এবং এটি সারা দেশের একটি গড় মূল্যতালিকা। অঞ্চল এবং রেস্তোরাঁর মানের ওপর ভিত্তি করে এই দামে কিছুটা পার্থক্য দেখা যেতে পারে। বুসান বা জেজু-র মতো উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দাম কিছুটা কম হতে পারে, আবার সিউলের কেন্দ্রস্থলে দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় এলে এই সি-ফুড কোর্সের স্বাদ নিতে ভুলবেন না
আজ আমি আপনাদের কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁর যে কোর্সের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম, তা আপনাদের কেমন লাগলো? স্যালাড দিয়ে শুরু করে ডিমের স্টিউ, সিউইড স্যুপ, মিক্সড ভেজিটেবল, কিমচি, সি-ফুড ফ্রাই, তাজা মিক্সড সাশিমি, সি স্কুইর্ট, সি কিউকাম্বার, অ্যাবালোন সাশিমি এবং সবশেষে স্পাইসি সি-ফুড স্যুপ—সব মিলিয়ে টেবিলভর্তি এই বিশাল আয়োজনই হলো কোরিয়ান সি-ফুড কোর্সের আসল পরিচয়। এটি শুধুমাত্র এক প্লেট মাছ খাওয়া নয়, বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি একটি সম্পূর্ণ খাদ্য সংস্কৃতি, যা কোরিয়ান র-ফিশ রেস্তোরাঁর আসল আবেদন। আপনি সমুদ্র থেকে কাছে থাকুন বা দূরে, সারা দেশের যেকোনো জায়গায় এমন দুর্দান্ত সব ডিশ উপভোগ করতে পারাটাই কোরিয়ান খাবারের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়। এখানকার দামও আপনার কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তাই আপনি যদি কখনো দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘুরতে আসেন, তবে অবশ্যই কোরিয়ান সি-ফুড বা সাশিমির এই কোর্সের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। আমি নিশ্চিত, এটি আপনার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা হবে!
এই পোস্টটি মূলত [https://hi-jsb.blog](https://hi-jsb.blog)-এ প্রকাশিত হয়েছে।